ফুটবল উন্মাদনায় পুরো বিশ্ব: রামগতির নাবিলকে মনে রাখেনি কেউ

S S

M

প্রকাশিত: ৩:৫১ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২৬

সারোয়ার মিরন:
বিশ্বব্যাপি ফুটবল বিশ্বকাপ একটি উন্মাদনার নাম। এ একটি প্রতিযোগিতাই বিশ্বকে একমূখী ও প্রচুর আবেগী করে তোলে। ফুটবলের এ উন্মাদনায় গা ভাসাতে সমর্থকরা কতোই কিছু না করে। কেউ পতাকা টানায়, কেউ বাড়ির দেওয়াল রং করে। কেউবা আবার চুল ছাঁটে, গালে মুখে রং মাখে। প্রিয় টিমকে উৎসর্গ করে পাগলাটে দর্শকরা করে অপ্রত্যাশিত কতো কান্ড।

বাংলাদেশও এর থেকে দুরে নই। দুরে নয় উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার ফুটবল প্রেমিরা। ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবল রামগতির ইতিহাসে সৃষ্টি করেছে একটি বিষাদময় ইতিহাস। প্রিয়দল আর্জেন্টিনার পতাকা বাড়ির পাশের গাছে উড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় এসএসপি পরীক্ষার্থী নাবিল।

২০২২ সালের বিশ^কাপ ফুটবলের দিন দুয়েকের বাকি। নিজের পছন্দের ফুটলবল টিম দেশ আর্জেন্টিনা। দিনটি ছিল শনিবার। ১৯ নভেম্বর ঠিক সকাল দশটায় আর্জেন্টিনার পতাকা উড়াতে উঠে পড়েন বাড়ির পাশের কড়ই গাছে। কাঁচা বাঁশটি হেলে পড়ে পাশে থাকা বিদ্যুদের মূল সঞ্চালন লাইনের উপর। সাথে সাথে বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়ে নাবিল। তার বাড়ি চররমিজ ইউনিয়নের একই গ্রামে। বাবার নাম মো. মুরাদ হোসেন। নাবিল স্থানীয় বিবিরহাট রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখায় এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

নাবিলের মৃত্যুতে তৎকালীন সময়ে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। দেশালোকসহ দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাংক্ষীসহ আত্মীয়স্বজন ভীড় জমিয়েছেন তার বাড়িতে। শোকার্ত বাবা মাকে তখন অনেকেই সাত্বনা দিয়েছেন। অনেকেই বিভিন্ন ধরনের আশ্বাসও দিয়েছেন।

এরই মধ্যে আবার এলো বিশ্বকাপ ২০২৬। সময়ের হিসেবে গড়িয়েছে চারটি বছর। কেমন আছে নাবিলের পরিবার? কিভাবে সন্তার হারানোর শোককে শক্তিতে রুপান্তর করে বেঁচে আছেন তার পরিবার। এ বিষয়ে বিস্তারিত দেশালোক টিম যায় নাবিলের বাড়িতে। কথা হয় নাবিলের মায়ের সাথে। তার মা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, নাবিলেরা দুই ভাই এবং দুই বোন। নাবিল পড়ালেখায় বেশ ভালো ছিল। ভালো ছিলো খেলাধুলায়ও। পড়ালেখা ও খেলাধুলায় উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বীকৃতির বেশ কয়েকটি স্মারক, জামা-কাপড় এবং বই পুস্তক আজো আগলে রাখছেন তিনি। বহুদিন পর ছেলের কথা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কথা বলার ক্ষমতা সাময়িক ভাবে হারিয়ে ফেলেন।

এরপর কথা হয় নাবিলের বাবা মুরাদ হোসেনের সাথে। সরাসরি কিংবা ভিড়িওতে তিনি ছেলের বিষয়ে কথা বলতে রাজী হননি। তারপরেও দেশালোক টিমের অনুরোধে তিনি জানান, চার বছর কেউ খোঁজ নেয়নি নাবিল এবং তার পরিবারের। অনেকে তখন অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কেউ মনে রাখেনি তাকে। মনের ভিতর পুঁষে রাখা শোক এখন পাথর। এক পর্যায়ে তিনিও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ছেলের কৃতিত্বের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ছেলে খেলাধূলায় বেশ ভালো ছিলো। জেলা প্রসাশকের হাত থেকে স্বীকৃতিও পেয়েছে। খেলাকে ভালোবেসে ছেলে (নাবিল) দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুক। তবে কারো প্রতি তার কোনো ক্ষোভ কিংবা চাওয়া পাওয়া নেই।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফুটবল বিশ^কাপ আয়োজনের এক মাসে উন্মাদনার খেসারতে জীবন দিয়েছেন ১২জন। তর্ক বিতর্কে আহত হয়েছেন অন্তত ২৭জন সমর্থক। হতাহতের সবাই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থক ছিলেন। খেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বিশ্বকাপেই বহু অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে থাকে। সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীরা এসব বিষয়ে নানান মতামত দিয়েছেন।

খেলাকে উপভোগ করতে গিয়ে মা-বাবা হারিয়েছে তার প্রিয় সন্তান। দেশ কিংবা বিশ^ কেউই তার জীবন উৎসর্গের কথা মনে না রাখলেও মা-বাবা পরিবার পরিজনের মনে থাকে সারাক্ষন। ছেলের স্বীকৃতি স্মারক কিংবা জামা-কাপড়ে স্মৃতি হাতড়ে বেঁচে আছেন তারা। নাবিলের মৃত্যুতে বিশ্ব কিংবা ফুটবল হয়তো কিছুই হারায়নি। কিন্তু পরিবার হারিয়েছে তার সন্তান, উত্তোরাধিকারকে। যার স্মৃতি বিষাদময় হয়ে নাড়া দিয়ে যাবে পরিবারের সদস্যদের। বিশ্বকাপ ফুটবল এলে এ যাতনা হয়তো কয়েকগুন বেড়ে যাবে। হারানোর বেদনা তারই বেশি যে হারিয়েছে।