যেসব কারনে এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের হ্যাট্রিক বিজয়

Sarwar Sarwar

Miran

প্রকাশিত: ১০:৪৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬

সারোয়ার মিরন: 

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসন থেকে তিনবার অংশ নিয়ে তিনবারই বিজয় হয়েছেন এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। তিনবারই অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি থেকে ধানেরশীষ প্রতিকে। প্রথমবার অংশ নিয়েছেন ২০০১সালে, এর পর ২০০৬সালে এবং এবার ২০২৬সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। প্রতিবারই ভোটের মাঠে দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে জাত চিনিয়েছেন তিনি।

বিএনপির কেন্দ্রিয় কমিটির সহ-শিল্প ও বানিজ্য বিষয়ক সম্পাদক এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান তার এ অভুতপুর্ব বিজয়ে যে বিষয়গুলো বিপুল সংখ্যক ভোটারকে দারুনভাবে প্রভাবিত করেছেন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত উপস্থাপন পাঠকদের জন্য এ লেখায় তুলে ধরছি-

কর্মীবান্ধব নেতা:
গত ১৭ বছরের আওয়ামী শাষনামালে নেতাকর্মীদের উপর মামলা-হামলায় প্রতিনিয়তই পাশে ছিলেন এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। এর আগে ২০০১ সাল থেকেও তিনি নেতা-কর্মীদের দু:খ কষ্টে আঠার মতো লেপ্টে ছিলেন। গ্রেফতার হলে আইনী সহায়তার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে জামিনের ব্যবস্থা করেছেন। উৎসব পার্বনে করেছেন নানান ভাবে সহায়তা। ব্যক্তিগত থেকে পারিবারিক খোঁজ-খবর নিয়েছেন অতি আন্তরিকতায়। বিশেষ করে নির্বাচনের দুদিন আগে গ্রেফতার হওয়া মীর আক্তার হোসেন বাচ্চুকে একদিনের মধ্যে জামিনে মুক্তির ব্যাপারটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

দুইবারের অভিজ্ঞতা:
এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান এর আগেও সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাঘা বাঘা মন্ত্রী এমপিদের সানিন্ধ্যে ছিলেন সবসময়। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে অংশগ্রহন এবং পরিচালনায় দুইবারের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ২০০১সালে নির্বাচনে হারিয়েছেন সিএইচপি আবদুর রব চৌধুরী এবং জাতীয় নেতা আসম আবদুর রবের মতো নেতাদের। তাই এ নির্বাচনেও পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। এছাড়াও এ বিএনপি নেতা জাতীয় মৎস্য ও পশুসম্পদ সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাবলিল ও হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা:
সংসদ সদস্য হিসেবে প্রথম দিকে এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের বক্তৃতা-বিবৃতি নিয়ে কিছুটা জড়তা থাকলেও দীর্ঘ পরিক্রমায় তিনি সে দুর্বলতা কেটে উঠেছেন। বর্তমানে তাকে পরিপক্ক বক্তাও বলা যায়। বিশেষ করে ২০০৬সালে সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে স্বল্প সংখ্যক সদস্য নিয়ে বিএনপির বিরোধী জোটে থাকার সময় সর্বক্ষেত্রে আলোচনায় ছিলেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিভিন্ন সভা-পথসভায় অত্যন্ত সাবলিল ও হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা এবং আলোচনা করেছেন- যা ভোটারদের মাঝে বেশ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে।

শক্তিশালী কর্মীবাহিনী:
রামগতি-কমলনগর উপজেলা দুটিতে প্রায় অর্ধলক্ষ পরীক্ষিত নেতা-কর্মী রয়েছে বিএনপির। বিগত দিনগুলোতে এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান এসব নেতা-কর্মীদের ঘিরে নিরলস কাজ করেছেন। দক্ষ একটি সাংগঠনিক কাঠামোতে রুপান্তর করে দুই উপজেলার বিএনপিকে রেখেছেন গ্রুপিং ও দলাদলিমুক্ত।

কমলনগর ফ্যাক্টর:
রামগতির উপজেলার নিজের স্থায়ী বাড়ি থাকার পরেও প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ভোটের মাঠে ভোটারদের কাছে আন্তরিকতা বাড়াতে রামগতিকে ভেঙ্গে কমলনগর নামে একটি আলাদা উপজেলা করেন। সেখানে একটি বাড়ি স্থাপন করেছেন তিনি। যার কারনে কমলনগরের জনসংখ্যার বৃহৎ একটি অংশের কাছে তিনি নিজের উপজেলার এবং কাছের লোক হয়ে উঠেন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি এ নির্বাচনসহ দ্বিতীয় প্রার্থীতায়ও ব্যাপক ভোটার টানতে সক্ষম হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে তো তিনি প্রায় ২৫হাজার ভোটের ব্যবধান তৈরি করেছেন কমলনগর উপজেলার ভোট দিয়েই।

প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীরা নতুন ও অনভিজ্ঞ:
সংসদ সদস্য হিসেবে এবিএম আশরাফ উদ্দিন এবারসহ তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পূর্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পক্ষান্তরে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্ধি তিন প্রার্থীর এর আগে এ পর্যায়ে নির্বাচন করা কিংবা নির্বাচিত হওয়া কোনটারই সুযোগ হয়নি। এ হিসেবে তিনি বেশ অভিজ্ঞ। ভোটের মাঠে তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

মিডিয়া ম্যানেজ:
এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর থেকে জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকটি পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে কাজে লাগিয়েছেন। গত বিজয় দিবসে উপজেলা প্রশাসনের অনুষ্ঠানে জামায়াতের একটি প্রতিবাদকেও ফলাও করে প্রচারে তার ভূমিকাও থাকতে পারে। শেষ পর্যায়ে তার প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী জামায়াত মনোনীত এআর হাফিজ উল্যাহর একটি অনপ্রভিত বক্তব্যকে দ্রুত গণমাধ্যমে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। যা নির্বাচনে বেশ প্রভাব ফেলেছে বলা যায়।

আওয়ামীলীগ নেতাদের ভোটে যুক্ত করা:
ইনক্লুসিভ নামক শব্দ প্রয়োগ করে তিনি আওয়ামীলীগের মধ্যম সারির বেশ কয়েকজন নেতাকে তার ভোটে যুক্ত করতে পেরেছেন। পাশাপাশি পৌরসভাসহ সবকটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বারদেরকেও যুক্ত করেছেন। যার ফলে আওয়ামীলীগ ঘরানার ভোটগুলোকে নিজের পকেটে পুরে নিয়েছেন।

সাবেক বিএনপি নেতাদের দলে ফেরানো এবং বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার:
একসময়ের প্রভাবশালী সাবেক বিএনপি নেতা ও চরগাজী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মীর আক্তার হোসেন বাচ্চুকে দলে ফিরাতে সক্ষম হয়েছেন। করিয়েছেন বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারও। পাশাপাশি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শরাফ উদ্দিন আজাদ সোহেলকে দলে ফিরিয়ে এনেছেন। ভোটের মাঠে এ দুজন নেতার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান এদুজনের ভোটব্যাংক নিজের পকেটে নিয়েছেন এ কৌশল অবলম্বন করে।

টানা উঠান বৈঠক:
রামগতি-কমলনগর উপজেলা দুটি মিলিয়ে গত এক বছরে প্রায় দুই শতাধিক উঠান বৈঠকে অংশ নিয়েছেন তিনি। এ বৈঠক তিনি নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তেও চালিয়ে গেছেন। বাড়ি-বাড়ি গিয়ে করা এসব উঠান বৈঠকে নারী-পুরুষ ভোটাদের মনোযোগ আকর্ষন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গাও করেছেন এসব বৈঠকের মাধ্যমে।

আর্থিক সংগতি:
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে আলোচনায় থাকা চার প্রার্থীর মধ্যে এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান আর্থিক ভাবে বেশ অবস্থাপন্ন ছিলেন। যা নির্বাচনে বেশ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছি। নির্বাচনের এ বিশাল কর্মযজ্ঞে আর্থিক ব্যয় করার সামর্থ ও মানসিকতা থাকাটাও বেশ জরুরি। এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান যা অক্ষরে অক্ষরে সম্পন্ন করেছেন।

নারীদের প্রাধ্যান্য ও ফ্যামিলি কার্ড প্রচারণা:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তার প্রচার প্রচারনা, সভাগুলোতে নারীদেরকে বেশ প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। তার পথসভা ও উঠান বৈঠকগুলোতে থাকতে বিপুল সংখ্যক নারীর উপস্থিতি। যার ফলে ভোটের দিন ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে নারীরা ভোট দিকে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন। এছাড়া কেন্দ্রিয় ইশতেহারে থাকা ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ডের প্রচারনা তিনি বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছেন।

জোটের প্রার্থীজট থেকে বেরিয়ে আসা:
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনটি জোটগত কারনে জেএসডি’র সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রবের মনোনয়ন পাওয়ার কথা ছিলো। নির্বাচনের একেবারে শেষ দিকে এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজের কৌশল প্রয়োগ করে এ আসনটিতে বিএনপি থেকে জোট ভেঙ্গে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আসেন। এর ফলে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য দ্বিগুন হয়ে ফিরে আসে। অন্যদিকে জোট থেকে মনোনয়ন না পেয়ে তানিয়া রব আলাদা প্রার্থী হওয়ায় অন্যদলের ভোটেও ভাগ বসিয়েছে। যার ফলে তার জয়ের পথ সুগম হয়েছে।

ধানের শীষ প্রতিকের প্রতি ভোটারদের দুর্বলতা:
উপকূলীয় এবং বিস্তীর্ণ জনপদ হওয়ায় এ অঞ্চলে ধান তথা ধানের শীষ প্রতিকের প্রতি সাধারণ মানুষ এবং ভোটারদের আলাদা একটি দুর্বলতা কাজ করে। তারা দল-বিদল বিবেচনা না করে ধানের শীষ প্রতিকে ভোট দিয়েছেন।

হেফাজত আন্দোলন ঘিরে সংসদে দেওয়া বক্তব্য ভাইরাল:
দ্বিতীয় মেয়াদে বিরোধীদলে থাকা অবস্থায় হেফাজতের উপর আওয়ামীলীগের স্টীম রোলার চালানোর প্রতিবাদে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রায় ৬মিনিটের একটি জ¦ালাময়ী বক্তব্য রাখেন। যা সে সময় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মনে ব্যাপক দাগ কাটে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন-চারদিন আগে এ প্রতিবাদী বক্তব্যটি ভাইরাল হয়ে উঠে।

অন্যান্য:
উপরোক্ত কারনগুলো ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি কারনে সাধারন ভোটার থেকে শুরু করে দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি বেশ সমাদৃত ছিলেন। যেমন- ক্লীন ইমেজ, দুর্নীতি বিরোধী শক্ত অবস্থান, প্রসাশনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বক্তৃতা-বিবৃতি, ধর্মীয় আলোচনা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন এবং বাস্তবতা নির্ভর একটি ইশতেহার।

 

— লেখক: 

সম্পাদক ও প্রকাশক, দেশালোক ডটকম