রামগতিতে প্রভাবশালীদের যোগসাজশে মেঘনায় ইলিশ নিধনের মহোৎসব

S S

M

প্রকাশিত: ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২৬

দেশালোক ডটকম:

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে চলছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এ সময় মেঘনা নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লক্ষ্মীপুরের রামগতির বিভিন্ন গোপন পয়েন্টে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একাধিক চক্র অবাধে মা ইলিশ শিকারের মহোৎসবে মেতেছে। প্রশাসনের ঢিলেঢালা অভিযানের সুযোগে মা ইলিশ শিকারের রীতিমতো উৎসবে নেমেছে এ সিন্ডিকেট। অন্যদিকে এসব ইলিশ বিক্রির জন্য সন্ধার পর থেকে সারারাত ধরে ভোর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে শত শত মাছ ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার বেশ কয়েকটি মাছঘাটে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। রামগতি উপজেলার বিবিরহাট ওছখালী, ব্রীজঘাট, আসলপাড়া, টাঙ্কিরঘাট, আলেকজান্ডার, বালুরচর, বাংলাবাজার এলাকার মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নির্বিচারে চলছে মা ইলিশ শিকার ও বেচা-কেনা।

গোপন সংবাদের ভিক্তিতে বৃহস্পতিবার সন্ধার পর রামগতি বাজার মাছঘাট সংলগ্ন মাংন্তাপাড়া নামক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাছ কিনতে বেশ কয়েকজন বেপারি অপেক্ষামান। সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে কয়েকজন বেপারী মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় স্থানীয় জেলে ও মাছ বেপারীরা জানান, বিকেলে ৮ থেকে ১০ টি নৌকা মাছ শিকারে নদীতে যায়। রাত ৭ টা থেকে ৮ টার মধ্যে মাছ নিয়ে তারা ঘাটে আসে। তাদের অপেক্ষা ক্রেতা ও বেপারী দাঁড়িয়ে রয়েছে। আবার সারারাত ধরে ১২ থেকে ১৫টি নৌকা মাছ শিকার করে ভোরে ঘাটে আসে। তখন মানুষের ভীড় আরও বেশী হয়। এসব নৌকা কার বা কাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে উপস্থিত একাধিক বেপারি জানান, এগুলো প্রভাবশালী মো. জাহাঙ্গীর আলম, ডলার নোমান ও হালিম মাঝির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে শুরু হয় জাটকা ধরার মহোৎসব। চলে সারারাত ধরে। রাতে বেশ কিছু নৌকা ও ট্রলার নিয়ে জেলেরা ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে পড়েন মেঘনায়। নদীতে নামা জেলেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে জাহাঙ্গীর, ডলার নোমান ও হালিম মাঝির সিন্ডিকেট চক্র তাদেরকে নদীতে মাছ শিকারের সহায়তা করছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ টির মত ছোট বড় ও মাঝারি নৌকা মেঘনায় মাছ শিকার করে। রামগতি বাজার মাছঘাট সংলগ্ন মাংন্তাপাড়া নামক এলাকায় জাহাঙ্গীরের সাথে চরগাজী ও বড়খেরী ইউনিয়নের আরো বেশ কয়েকজন জড়িত রয়েছেন বলে জানান ওই এলাকার দুইজন বিএনপি নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির ওই দুই নেতা বলেন, এগুলো বললে সমস্যা হয়। দলের নেতাকর্মীরা কেউ কারো কথা শুনতে চায় না।

মাছ কিনতে আসা সিরাজ উদ্দিন, রফিক মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে তারা প্রায় এসে এ স্থান থেকে মাছ নিচ্ছেন। শুধু তারা নয়, প্রায় ২ শতাধিক বেপারি নিয়মিত মাছ ক্রয় করছেন। পেটের দায়ে এবং ঋণের কারণে জেলেরা নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনসহ সকল সাইড ম্যানেজের দায়িত্ব রয়েছেন এসব প্রভাবশালীরা।

স্থানীয় রামগতি বাজারের ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেন অভিযোগ করেন, এ বছর মা ইলিশ ধরা রুখতে নিষেধাজ্ঞাকালীন প্রশাসনের তৎপরতা বেশ ঢিলেঢালা। এ সুযোগে নির্বিচারে ইলিশ শিকার হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনের কড়াকড়ি আরও বেশি ছিল।

অভিযোগ অস্বীকার করে মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাজনীতি করার কারণে তার পক্ষে-বিপক্ষে শত্রু রয়েছে। তারা হয়তো এমন অভিযোগ করেলও করতে পারে। তবে তিনি এ কাজের সাথে জড়িত নন।

রামগতি উপজেলা যুবদলের আহবায়ক শিবলী নোমান বলেন, সরকারের আইন অনুযায়ী ২২ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এসময় কেউ যদি রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে নদীতে মাছ ধরার সাথে কোন প্রকার জড়িয়ে পড়েলে আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। এতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। অপরাধীর পরিচয় অপরাধী।

রামগতির বড়খেরী নৌ-পুলিশের ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, জনবল সংকট সহ নানা কারণে এ বিশাল নদী পাহারা দিয়ে রাখাটা কষ্টকর। তবুও সাধ্য অনুযায়ী নৌ-পুলিশের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।

রামগতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, এ নামগুলোর কথা আমিও শুনে আসছি। গত দুইদিন ধরে আমি ওই স্থানে বেশ কয়েকবার গিয়েছে। জাহাঙ্গীরকে টেলিফোনে সতর্কও করেছি। কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে। শুক্রবার থেকে অভিযান কঠোর করা হবে।

লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে আমরাও শুনেছি। সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মা ইলিশ সংরক্ষণের জন্য চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকাসহ দেশের সকল নদ-নদীতে সব ধরনের ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ করে সরকার।